সোমবার, ২১ নভেম্বর, ২০১১

একুশে ফেব্রুয়ারি এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট


একুশে ফেব্রুয়ারি এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট
ড. মোঃ জালাল উদ্দীন মোল্লা*

মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে যেমন কিছু বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিন থাকে, তেমনি আমাদের জাতীয় জীবনেও বেশ কিছু স্মরণীয় এবং তাৎপর্যপূর্ণ দিন রয়েছেযে দিনগুলো আপন মহিমায় ও অনন্য বৈশিষ্ট্যে মণ্ডিত হয়ে বিশেষ মর্যাদায় স্বতন্ত্রভাবে ইতিহাসের পাতায় স্থান  লাভ করেছেএকুশে ফেব্রুয়ারি বা শহীদ দিবস বা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের কাছে সে রকম একটি দিনআমাদের জাতীয় জীবনে একুশে ফেব্রুয়ারি একদিকে যেমন গৌরবোজ্জল এবং স্বমহিমায় ভাস্বর, অন্যদিকে তেমনি ত্যাগের মহিমায় উদ্দীপ্তঅমর একুশে বাংলাদেশের সর্বস্তরের সকল মানুষের চেতনায় প্রদীপ্ত একটি দিন, একটি স্বপ্ন, একটি বেদনা, একটি উল্লাসসর্বোপরি একুশ আমাদের অহংকারঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ এ দিনটি তাই বার্ষিক পরিক্রমায় ফিরে ফিরে আসেআর বাংলাদেশের প্রাণ থেকে উৎসারিত হয় সেই অবিনাশী শোক সংগীত :
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি?
এবং
সালাম সালাম, হাজার সালাম,
সকল শহীদ স্মরণেপ্রভৃতি
ঐতিহাসিক পটভূমি :
মানুষের জীবনে মাতৃভাষার অবিচ্ছেদ্য ভূমিকা সম্পর্কে জার্মান মনিষী ভিলহেল্‌ম হামবোল্ট বলেছেন, মানুষের ভাষা তার আত্মা, আর আত্মাই হলো তার ভাষাআর বহুভাষাবিদ পণ্ডিত ও জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ বলেছেন, তিনটি জিনিষ একজন মানুষের সবচেয়ে প্রিয় হওয়া উচিত- মা, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষামা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমি প্রতিটি মানুষের কাছে যেমন তার সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ, বাংলাভাষাও তেমনি বাঙালির শ্রেষ্ঠ সম্পদ, শ্রেষ্ঠ আবেগএ ভাষা আমাদের মায়ের ভাষা, এর সাথে তুলনা হয় না পৃথিবীর কোন কিছুরইতাই আমরা গর্ব করে বলতে পারি :
মোদের গরব মোদের আশা
আ-মরি বাংলা ভাষা
ঐতিহাসিক কোন ঘটনাই বিচ্ছিন্ন কোন মুহূর্তের স্মারক নয়, বরং ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় প্রতিটি ঘটনারই যেমন একটি নিজস্ব অবস্থান থাকে, তেমনি ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের একুশে ফেব্রুয়ারির যে মর্মান্তিক ঘটনা বিশ্ববাসীকে স্তম্ভিত করেছিল তারও পূর্ব ইতিহাস রয়েছে
দুশ বছরের বৃটিশ শাসন-শোষণের অবসানের পর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে সমগ্র ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটেস্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমানে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ) সাধারণ মানুষ আশায় বুক বেঁধে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন যে, এবার তাঁরা অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তিসহ স্বাধীনভাবে আধুনিক শিক্ষা-দীক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে সার্বিক উন্নতিলাভ করবেকিন্তু শুরু থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী  বৃটিশ কায়দায় শাসন-শোষণসহ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ (৫৪%) মানুষের মাতৃভাষা বাংলার উপর যখন চরম আঘাত হানে তখন পূর্ব পাকিস্তানের সর্বস্তরের মানুষের স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায় এবং আশায় গুঁড়েবালি পড়েপূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বুঝতে পারে যে, ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের মাধ্যমে খণ্ডিত স্বাধীনতা পেলেও  তাঁদের স্বাধিকার আদায়ের সংগ্রাম শেষ হয় নিযদিও সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা  কী হবে? এ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দেই ভারতের আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর নাম প্রস্তা করেনআর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং বহুভাষাবিদ পণ্ডিত ও জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ প্রস্তাব করেন বাংলাভাষারপাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে তমুদ্দুন মজলিশ ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা-না উর্দু শিরোনামে  একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেতমুদ্দুন মজলিশ-এর কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেম এ পুস্তিকায় প্রস্তাব রাখেন যে,  বাংলাভাষাই হবে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন, আদালতের ভাষা ও অফিসাদির ভাষাআর  পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ভাষা হবে দুটি- উর্দু ও বাংলাতারপরও ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ২১ মার্চ কার্জন হলের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের জনক বলে খ্যাত  কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্‌ যখন বলেন Urdu only, and Urdu shall be the state language of Pakistan. অর্থাৎ উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষাতাৎক্ষণিকভাবে তিনি প্রবল প্রতিবাদের মুখে পড়েনতারপর পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ছাত্র সমাজ, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, বিভিন্ন সংগঠনসহ সর্বস্তরের মানুষ জোর দাবী জানাতে থাকলেও গণদাবী উপেক্ষা করে ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জানুয়ারি পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন উর্দুকেই আবার রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দিলে পূর্ব পাকিস্তানের সর্বস্তরের জনগণ পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক ও শোষকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়েখাজা নাজিমুদ্দিনের ঘোষণার প্রতিবাদে ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র-ধর্মঘট, ১১ ফেব্রুয়ারি পূর্ব পাকিস্তানব্যাপী প্রস্তুতি দিবস, ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন এবং পূর্ব পাকিস্তানে সর্বাত্মক ধর্মঘট আহ্বান করা হয়প্রবল গণআন্দোলনে আতংকিত হয়ে শাসকগোষ্ঠী ২০ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে মিছিল, শোভাযাত্রা, জনসভা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেকিন্তু ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে ছাত্ররা ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে ছোট ছোট মিছিল বের করলে পুলিশ প্রথমে বেধড়ক লাঠিচার্জ করে, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও গ্রেফতার করে এবং পরে নির্বিচারে গুলি চালায়ফলে অসংখ্য মানুষ আহত হন এবং রফিক, শফিক, সালাম, বরকত ও জব্বারসহ নাম না-জানা অনেকেই শহীদ হন২১ ফেব্রুয়ারির কাপুরুষোচিত ঘটনায় বিক্ষোভে প্রতিবাদে ঢাকায় রাজপথসহ সমগ্র দেশ উত্তাল হয়ে ওঠেপরদিন সারারাত জেগে শহীদদের স্মরণে স্মৃতির মিনার তৈরি করা হয়কিন্তু পুলিশ তা ভেঙ্গে দেয়আবার গড়ে ওঠে মিনারআর ক্ষুব্ধ কবি তাই বলে ওঠেন :
স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার?
ভয় কি বন্ধু, আমরা এখনও
চারকোটি পরিবার
খাড়া রয়েছি তোযে-ভিত কখনও কোন রাজন্য
পারে নি ভাঙতে
ভাষা আন্দোলনের এই মিনার আমাদের ক্ষোভ, আমাদের অশ্রুবিন্দু, আমাদের দুর্জয় শপথ, আমাদের অহংকার, আমাদের চেতনা
একুশের তাৎপর্য :
একুশের তাৎপর্য বহুমাত্রিক হলেও ক্রমেই একুশ তার গৌরবোজ্জল ভূমিকা হারাচ্ছেআজকের বাংলাদেশের সর্বত্রই একুশের তাৎপর্য ভূলুন্ঠিত হচ্ছেআনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব একুশ আজ সুবিধাবাদীদের করতলে নিস্পেষিত হচ্ছেদুঃখজনক হলেও সত্য যে, যে একুশের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছিসেই স্বাধীনতা লাভের চার দশক পেরিয়ে গেলেও স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলাভাষা আজও তার যথাযোগ্য মর্যাদা পায় নিভাষা শহীদ, ভাষা সৈনিক তথা তাঁদের পরিবারগুলোর জন্য দৃষ্টান্তমূলক এমন কিছু আমরা করতে পারি নি, যা পরবর্তী প্রজন্ম তথা দেশ ও জাতির সামনে উদাহরণ হয়ে থাকবেযে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলার দামাল ছেলেরা রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করেছিল সে গণতন্ত্র আজও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে নিবাংলার রাজনৈতিক আকাশ এখনও শঠতার মেঘে আচ্ছন্নসাংস্কৃতিক জমিন আজও দালাল আগাছায় পরিপূর্ণজনসাধারণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত নব প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলাভাষা ও সাহিত্য পড়ানো হচ্ছে নাএকইভাবে, সার্টিফিকেট বিক্রির লক্ষ্যে ও ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিষ্ঠিত আমাদের দেশের বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও বাংলাভাষা ও সাহিত্য চরমভাবে উপেক্ষিতফলে সমাজের সর্বত্রই আজ অপসংস্কৃতির জয়জয়কারআকাশ সংস্কৃতি, মেকি আধুনিকতা, কর্পোরেট কালচার ইত্যাদির বদৌলতে অপসংস্কৃতি চর্চা ডালপালা ছড়িয়ে পুষ্টতা লাভ করেছেতাই ফুলের তোড়া নিয়ে একুশের গান গেয়ে বছরে কেবলমাত্র একটি দিনের জন্য শহীদ মিনারে গেলেই একুশ তার মর্যাদা ফিরে পাবে নাএকুশের তাৎপর্যকে জাতীয় জীবনে প্রতিফলিত করতে হলে দেশপ্রেমের নিখাদ দৃষ্টান- তুলে ধরতে হবেঅফিস-আদালতসহ রাষ্ট্রের সর্বত্র বাংলাভাষা চালু করতে হবেসেই সাথে ব্যবহারিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেও শুদ্ধ বাংলাভাষা চর্চা করতে হবে
একুশের চেতনা :
মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যুগে যুগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে এবং সে আন্দোলন-সংগ্রামগুলো করতে যেয়ে অসংখ্য মানুষকে অকাতরে তাদের জীবন দিতে হয়েছেকিন্তু ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে এমন বিরল নজির পৃথিবীর ইতিহাসে নেইমায়ের ভাষার সম্মান রক্ষার জন্য এতখানি আত্মত্যাগ একমাত্র বাঙালি জাতি ছাড়া পৃথিবীর আর কোন জাতিকেই করতে হয় নিতাই ভাষা আন্দোলন বাঙালিকে দিয়েছে আপন সত্তা আবিস্কারের মহিমা এবং একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির জাতীয় জীবনে এক মহত্তম চেতনাএকুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির আত্মপোলব্ধির মূল কেন্দ্রবিন্দুকারণ একুশের পথ বেয়েই আমরা আরোহন করেছি আমাদের স্বাধীনতার জটিল-কঠিন সিঁড়িতে১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ভাষা আন্দোলন পূর্ণতা লাভ করেছে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের স্বাধীনতা সংগ্রামেভাষা আন্দোলনের সফল পরিণতি ঘটেছে আমাদের মুক্তি সংগ্রামেমাতৃভূমির স্বাধীনতার মধ্য দিয়েই আমাদের মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার প্রেরণা পূর্ণতা লাভ করেছেতাই একুশ আমাদের চেতনায় চিরভাস্বর, চির অম্লান, একুশ আমাদের অহংকারএকুশের চেতনা সম্পর্কে ড. মোহাম্মদ এনামুল হক বলেছেন, একুশে ফেব্রুয়ারি কোন দিন নয়, ক্ষণ বা তিথি নয়, একটি জাতির জীবন- ইতিহাসএ ইতিহাস অগ্নিগর্ভ .............................. একেবারে জীবন্ত 
একুশে ফেব্রুয়ারি এবং আমাদের সংস্কৃতির বিকাশ                 
আমাদের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি একুশের চেতনায় অনুরণিত হয়েছেতাই অমর একুশকে নিয়ে জহির রায়হান লিখেছেন আরেক ফাল্গুন, একুশের গল্প; আলাউদ্দিন আল আজাদ লিখেছেন স্মৃতির মিনার; মুনীর চৌধুরী রচনা করেছেন অসাধারণ নাটক কবরহাসান হাফিজুর রহমান একুশে ফেব্রুয়ারি নামক কবিতা সংকলন করেছেনমাহবুব-উল-আলম চৌধুরী ক্ষুব্ধচিত্তে লিখেছেন একুশের কবিতা কাঁদতে আসি নি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছিএছাড়া প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে অসংখ্য সংকলন প্রকাশিত হয়তাই আমাদের সংস্কৃতির বিকাশে একুশের ভূমিকা অপরিসীম
একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস :
অমর একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতি-সত্তা ও জাতীয় ইতিহাসের একটি গৌরবোজ্জল দিন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাইলফলক (milestone)একুশ আমাদের জাতীয় অহংকারএকুশে ফেব্রুয়ারিকে নিয়ে বাঙালি জাতির যেমন প্রাণের আবেগ ও উচ্ছ্বাস রয়েছে তেমনি শোক ও ব্যথাও রয়েছেবাঙালি জাতির এ আবেগ ও উচ্ছ্বাস এবং শোক ও ব্যথার প্রতি সম্মান জানিয়ে জাতিসংঘের অংগ সংস্থা ইউনেস্‌কো (UNESCO; United Nations Educational Scientific and Cultural Organization) একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছেফলে একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছেএজন্য অবশ্য অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হয়েছে
১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে ভারতের বাংলা ভাষাভাষি ত্রিপুরা রাজ্য সরকার তাদের রাজ্যে একুশে ফেব্রুয়ারিকে বাংলাভাষা দিবস হিসেবে পালন করার ঘোষণা দেয়পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যেও বেসরকারীভাবে একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়আর বাংলাদেশের গফরগাঁও থেকে গফরগাঁও থিয়েটার নামক একটি সংগঠন ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে তাদের এক অনুষ্ঠানে সর্বপ্রথম একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মর্যাদা প্রদানের দাবী উত্থাপন করে এবং ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস চাই প্রচ্ছদ অংকিত অর্ঘ্য নামে প্রকাশিত একুশে সংকলনে তাদের দাবী পূনর্ব্যক্ত করে নিবন্ধ প্রকাশ করা ছাড়াও তাতে তারা একুশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চাই শীর্ষক শ্লোগান মুদ্রিত করেএকই বছর গফরগাঁওয়ের নাট্যকর্মীরা একুশে ফেব্রুয়ারির বিশ্ব মর্যাদা দাবী করে শোভাযাত্রা বের করে, শহরের দেয়ালে পোস্টারিং করে বাস-ট্রেনে স্টিকার লাগায়বাংলাদেশ অবজারভার ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের ৩০ নভেম্বর চুয়াডাঙ্গার জনৈক প্রকৌশলী জনাব ম. ইনামুল হকের একটি চিঠি প্রকাশ করেচিঠিতে জনাব হক দাবী করেন যে, একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্র্জাতিক মর্যাদা দানের আহ্বান জানিয়ে ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মার্চ তিনি জাতিসংঘের মহাসচিব মি. কোফি আনান-এর কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেনতবে এক্ষেত্রে কানাডা প্রবাসী দুই বাংলাদেশী জনাব রফিকুল ইসলাম ও জনাব আব্দুস সালাম অত্যন্ত উদ্যোগী ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং তাঁদেরকে সহযোগিতা দেন জাতিসংঘের জনসংযোগ কর্মকর্তা (Public Relations Officer) জনাব হাসান ফেরদৌসআর যে সংগঠনটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে সেটি হলো কানাডার মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার অব দ্যা ওয়ার্ল্ড (Mother Language Lover of the World)নিয়মতান্ত্রিক সকল প্রক্রিয়া শেষে ইউরোপের ছোট দেশ হাঙ্গেরী-এর সমর্থনে ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে ইউনেস্‌কোর সাধারণ সভায় প্রস্তাবটি পাশ হয়ইউনেস্‌কো কর্তৃক অসামান্য এ স্বীকৃতি দেয়ার পর সারা বিশ্ব আজ বাংলাভাষাকে সম্মান করছেআমাদের একুশে ফেব্রুয়ারি এখন পৃথিবীর সর্বত্র আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে উদ্‌যাপিত হচ্ছেইউনেস্‌কোর এ স্বীকৃতি বাংলা ভাষাভাষিদের জন্য, বাংলাদেশীদের জন্য তথা বাংলাদেশের জন্য সীমাহীন গৌরবের ও মর্যাদার বিষয়
একুশ এবং বাংলা একাডেমি :
বাঙালি জাতির মেধা ও মননের প্রতীক বাংলা একাডেমি একুশে ফেব্রুয়ারিরই ফসল১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৩ ডিসেম্বর বর্ধমান হাউসে কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড নামে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলা একাডেমিআর প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাংলাভাষা ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধিকরণ, গবেষণা, প্রচার, প্রসার এবং লালন-পালনের মহান দায়িত্ব অর্পিত হয় বাংলা একাডেমির ওপরবাংলা একাডেমি প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসে মাসব্যাপী বইমেলা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম এবং বাঙালি সংস্কৃতি কেন্দ্রিক সংগীতানুষ্ঠান প্রভৃতি আয়োজনের মাধ্যমে একুশের মহান চেতনাকে জাতির সামনে তুলে ধরে আসছে
একুশের শপথ :
অমর একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমাদের শপথ হবে- প্রকৃত অর্থে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলাভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করাঅফিস-আদালতসহ বাংলাদেশের সকল কাজ বাংলাভাষায় সম্পন্ন করার মাধ্যমে বাংলাভাষাকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়াসর্বোপরি, বাংলাভাষাকে বিশ্বপ্রসারী করে তুলতে হবেবাংলাভাষার প্রতি সম্মান জানিয়ে ইউনেস্‌কো কর্তৃক একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার ফলে আমাদের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছেতাই বাংলাভাষাকে সুন্দর, সঠিক ও সফলভাবে বিশ্বের দরবারে উপস্থাপন করতে হবে
    সবশেষে বলা যায় যে, একুশ আমাদের অহংকার, একুশ আমাদের শক্তিতাছাড়া আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনা বিকাশেও একুশে ফেব্রুয়ারির ভূমিকা অপরিসীম হওয়ায় ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি যে সকল তরুণ নিজেদের বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করেছিলেন তাঁদের সে আত্মত্যাগের মহিমা বৃথা যায় নিআমরা সেই চেতনাকে উদ্দীপ্ত করে সমৃদ্ধ দেশ গঠনে নিজেদেরকে নিয়োজিত করব- এই হোক একুশের প্রার্থনা

*সাধারণ সম্পাদক, একুশে চেতনা পরিষদ, পার্বতীপুর, দিনাজপুর এবং প্রভাষক, প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগ, কাউনিয়া ডিগ্রী কলেজ, কাউনিয়া, রংপুর০১৭২৩-৮৫৭৬০৩

0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন